ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
রামকান্তুপুর ইউয়িনের মোহনশাহ’র বটতলার গোল চত্বর এর উদ্বোধন রাজবাড়ীতে মাদকদ্রব্যর অপব্যবহার ও পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস ও আলোচনা সভা রাজবাড়ীতে ডিবি পুলিশের অভিযানে মাদক ব্যবসায়ী মোজাম্মেল আটক রাজবাড়ী শহর রক্ষা প্রকল্প (ফেইজ-২) বাস্তবায়ন বিষয়ক সাধারণ সমন্বয় সভা সন্ধ্যার মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করতে হবে-প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী রামকান্তপুর ইউনিয়ন ও পৌর নবাসীকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সোহেল রানা। ঈদুল ফিতর’ উপলক্ষে চন্দনী ইউনিয়বাসীর সুস্বাস্থ্য, সুখ-সমৃদ্ধি ও অনাবিল আনন্দ কামনা করে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন-শাহিনুর পৌরবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন যুবলীগ নেতা মীর সজল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকেঈদের শুভেচ্ছা কাজী ইরাদত আলীর সদর উপজেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে ইফতার বিতরণ

এমপি পুত্রের চাঁদাবাজি- দায় কার?

ইমরুল কায়েস
জনপ্রতিনিধিদের সন্তানদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা দখলদারিত্বে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সব সরকারের আমলেই এ চিত্র দেখা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে কখনো কখনো প্রত্যক্ষভাবে আবার কখনো কখনো পরোক্ষভাবে মদদদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তারা। তবে ইদানিং জনপ্রতিনিধিত্বের শীর্ষ স্তর সংসদ সদস্য বা এমপিদের পুত্র বা আত্মীয় স্বজনের দাপট আগের যেকোন সময়ের তুলনায় বেশী বলেই মনে হচ্ছে। মাঠে শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমপিদের পুত্র বা ভাই অথবা আত্মীয়-স্বজনরা বাধাহীন একচ্ছত্র আধ্যিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা সংবাদ পত্রের পাতা খুললেই অহরহ চোখে পড়ছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। কিছু কিছু জায়গায় তো এমপিদের স্বজনরা রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। কথা না শুনলে সরকারী কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তোলা, জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা ঘটনার সাথে নাম আসছে মন্ত্রী-এমপি’র পুত্রদের।

সম্প্রতি চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ আটক করেছে সাতক্ষীরার সংরক্ষিত মহিলা এমপি রিফাত আমিনের ছোট ছেলে রাশেদ সরোয়ার ওরফে রুমন। চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় গত ১৮.০৯.১৬ তারিখে তাকে আটক করে সাতক্ষীরা পুলিশ। চাঁদাবাজির দুটি অভিযোগে মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। রুমনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগটি দায়ের করেন তার মা যে দলের মনোনয়নে সংরক্ষিত কোটায় এমপি হয়েছেন সে দলেরই অঙ্গ সংগঠনের এক নেতা। দ্বিতীয় মামলাটিও চাঁদাবাজির, মামলাটি করেছেন সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। এবারই প্রথম নয় এর আগেও রুমন পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাগারে কয়েক দিনের জন্য অন্তরীণ ছিলেন। গত মে মাসে পুলিশ অস্ত্র ও তিন নারীসহ তাকে আটক করেছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি।

তবে শুধু রুমনই নয়, এরকম আরো অনেক এমপি আছেন যাদের পুত্র ধনরা নানা কীর্তি করে পত্রিকার হেড লাইন হয়ে মা-বাবার ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করেছেন। বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রীও অতীতে বহুবার ছেলের কুকীর্তির জন্য বার বার সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন। তবে তাতে পদাবনতির পরিবর্তে তার পদোন্নতি হয়। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকারে প্রতিমন্ত্রী থাকলেও এখন আরো একধাপ এগিয়ে তিনি ফুল মন্ত্রী হয়েছেন। এটাই যেন আমাদের দেশের স্বাভাবিক নিয়মে দাঁড়িয়েছে। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য লজ্জার। কারণ পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্তান অথবা আত্মীয়দের দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে মন্ত্রিত্ব বা এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নজির ভুরি ভুরি থাকলেও আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

আইনগত ভাবে হয়তো সন্তানের কুকীর্তির দায় পিতা-মাতার ওপর বর্তায় না। তবে নৈতিক ও সামাজিক বিচারে সন্তানের কুকীর্তির দায় পিতা-মাতা এড়াতে পারেন না। সন্তানের সুকীর্তিতে পিতা-মাতা যদি গর্বিত হয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে চারদিকে তা জাহির করে অন্যদের জানান দিতে পারেন তবে তার কুকীর্তির দায় তারা নেবেন না কেন? তাছাড়া সন্তান নৈতিক মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষা তো পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে। সন্তান সেই শিক্ষা না পেলে তা অবশ্যই পিতা-মাতার ব্যর্থতা বা দায়।

নৈতিক বোধসম্পন্ন সুশিক্ষিত সন্তান কখনোই রুমনদের মতো কুকীর্তি করে বাবা-মাকে ছোট করতে পারেন না। সন্তানদের সে শিক্ষা আমাদের এমপি মহোদয়রা কতটা দেন তার খোঁজ না জানলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধ সংগঠনে উৎসাহিত যে করেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কারণ অতীতে এরকম ঘটনার নজির রয়েছে। বিগত সরকারে রাজশাহী বিভাগের একজন প্রতিমন্ত্রীর ছেলে ও আত্মীয় স্বজনরা একবার তার নির্বাচনী এলাকায় টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সরকারী কর্মকর্তাদের মারধোর করেন। এঘটনা সেসময় সব কটি পত্রিকায় গুরুত্বসহ ছাপা হয়। তবে সংবাদ পত্র গুরুত্ব দিলেও এ ঘটনাকে তেমন একটা পাত্তা দিলেন না প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই ভাগ্যের জোরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া জেলা পর্যায়ের ওই নেতা। শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে তিনি উল্টো অপরাধী স্বজনদের পক্ষে সাফাই গাইলেন। অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমার কিছু দুষ্ট আত্মীয়-স্বজনের কাজ এটি। অর্থাৎ দুষ্ট আত্মীয় স্বজনের কাজ বলে তিনি অপরাধের মাত্রাকে হাল্কা করে দিলেন, যেন এটি কোন ব্যাপারই না। ছোট ছোট ছেলেপেলেরা একটু দুষ্টুমি করেছে মাত্র, এটা আসলে আমলে নেয়ার কিছু না, যাহ, তোরা আর এসব করিস না। তার কথার মর্মার্থ যেন এমনটাই।

পরিবার কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সন্তানরা পিতা-মাতা অথবা পরিবারের বড়দের কাছ থেকে আচার-আচরণ শিখে থাকে। এমনকি সন্তানরা ছোট বেলায় অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অনুকরণও করে থাকে, যা তাদের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তান যাতে পরিবার থেকে সুশিক্ষা পায় সেজন্য নিজেদের আচার-আচরণেও সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু আবারো দু:খের সাথে বলতে হচ্ছে নিজেদের আচরণের ক্ষেত্রেও আমাদের মাননীয় এমপি-মন্ত্রীদের কেউ কেউ (সবার কথা বলছি না) খুব বেশী সতর্ক বলে মনে হয় না। গত আগস্ট মাসের ২৯ তারিখে শোক দিবসের আলোচনার আয়োজন করে ঢাকা আইনজীবি সমিতি। আমি ওই অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহে গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনা প্রাসঙ্গিক হওয়ায় এখানে উল্লেখ করছি। অনুষ্ঠানে যোগ দেন সরকারের মান্যবর দুই মন্ত্রী। মাগরিবের নামাজের ওয়াক্তে বিশেষ অতিথি মন্ত্রী বাহাদুর বার ভবনেরই সপ্তম তলায় গেলেন নামাজ পড়তে। নামাজের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ঢোকার মুখে তিনি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন, এরপর ভৃত্য গোছের একজন এগিয়ে এসে মন্ত্রী বাহাদুরের পায়ের জুতা খুলে দিলেন। এমনকি নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত লোকটি জুতা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। নামাজ শেষে মন্ত্রী মহোদয় বের হয়ে আসলে ভৃত্য গোছের লোকটি আগের মতোই তার পদ যুগলে জুতা দু’খানি পরিয়ে দিলেন। এরপর মন্ত্রী বাহাদুর দিব্যি হেঁটে সপ্তম তলা থেকে অস্টম তলায় উঠে অনুষ্ঠানস্থলে গেলেন। তার কোন সমস্যা থাকলে তো পায়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় ওঠার কথা নয়। তাই সমস্যার কারণে অন্যকে দিয়ে তিনি নিজের পায়ে জুতা পরিয়ে নিয়েছেন, সে কথাটি সরলভাবে বলা কঠিন। মানবিক বোধের সঠিক জ্ঞানের কমতিতে আমাদের দেশের কোন কোন মন্ত্রী-এমপি (সবাই না) নিজেদের মুই কি হনুরে গোছের ভাবেন। তাদের কথা-বার্তা আচার-আচরণে তার বহি:প্রকাশ ঘটে অহরহ। হয়তো আমার দেখা মন্ত্রী বাহাদুরের কর্মটি সেই গোছেরই কিছু একটা হবে। তা নিজ ভৃত্যকে দিয়ে তিনি জুতা পরা বা খোলার কাজটি করতেই পারেন, তাতে অন্যের কিইবা যায় আসে। কিন্তু সমস্যা হলো এই কর্মটি যদি তিনি নিয়মিত করান এবং শুধু লোক সম্মুখেই নয়,বাড়ীতেও তা করান তবে তার সন্তানরা কি শিখবে? পিতার মতো তারাও তো ভৃত্য দিয়ে জুতা পরা এবং খোলার কাজটি শিখবে। জনসম্মুখে এমন কাজ করতে পিতা যেমন লজ্জিত হননি, সেও তেমনি বীরদর্পে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে নি:সঙ্কোচে।

অথচ ছোট বেলায় পড়েছিলাম মুঘল বাদশাহ আলমগীর, ছেলে শিক্ষকের পায়ে শুধু পানি ঢেলেছে, হাত দিয়ে ধুয়ে দেয়নি কেন তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, ব্যথিত হয়েছিলেন। কবি কাদের নেওয়াজের কবিতায় ফুটে ওঠে সেই চিত্র- বাদশাহ কহেন, ‘সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে / নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন ? পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ওচরণ / নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে / ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে। একজন বাদশাহ যদি নিজ ছেলেকে দিয়ে গৃহশিক্ষকের পা ধুয়ে দিতে বলেন আর একজন মন্ত্রী বাহাদুর যদি ভৃত্যকে দিয়ে নিজের জুতা পরিয়ে নেন, তাহলে দুজনার কার ছেলে কি শিখবে, এর বিচার পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিলাম। সন্তানদের আদর্শ শিক্ষার মাধ্যমে যেমন বড় করতে হবে তেমনি আচরণ সংশোধন করে নিজে মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, তবেই সন্তানরাও আদর্শবাদী ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নির্লোভ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। সন্তান অপরাধ করলেও তার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না করে এমপি-মন্ত্রিত্বের উষ্ণ চাদরে অপরাধী সন্তানকে ঢেকে রাখলে সমাজে আইনের শাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে না, তেমনি ওই সন্তান ভবিষ্যতে দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে আরেকটি অপরাধ সংগঠণ করবে যা তার পিতা-মাতার ভাবমুর্তিকেই সঙ্কটে ফেলবে। রুমন মার্কা সন্তানের জন্য এমপি মায়েদেরও লজ্জিত হতে হবে বার বার।

ইমরুল কায়েস, সিনিয়র রিপোর্টার(কুটনৈতিক), বাংলাভিশন
kayeshdu@gmail.com

(দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত ০৪.১০.১৬)

Tag :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক তথ্য সম্পর্কে

Meraj Gazi

জনপ্রিয় পোস্ট

রামকান্তুপুর ইউয়িনের মোহনশাহ’র বটতলার গোল চত্বর এর উদ্বোধন

এমপি পুত্রের চাঁদাবাজি- দায় কার?

আপডেটের সময় : ১০:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০১৬

ইমরুল কায়েস
জনপ্রতিনিধিদের সন্তানদের চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা দখলদারিত্বে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় সব সরকারের আমলেই এ চিত্র দেখা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে কখনো কখনো প্রত্যক্ষভাবে আবার কখনো কখনো পরোক্ষভাবে মদদদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তারা। তবে ইদানিং জনপ্রতিনিধিত্বের শীর্ষ স্তর সংসদ সদস্য বা এমপিদের পুত্র বা আত্মীয় স্বজনের দাপট আগের যেকোন সময়ের তুলনায় বেশী বলেই মনে হচ্ছে। মাঠে শক্তিশালী বিরোধীদল না থাকায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমপিদের পুত্র বা ভাই অথবা আত্মীয়-স্বজনরা বাধাহীন একচ্ছত্র আধ্যিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা সংবাদ পত্রের পাতা খুললেই অহরহ চোখে পড়ছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডার বাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন তারা। কিছু কিছু জায়গায় তো এমপিদের স্বজনরা রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। কথা না শুনলে সরকারী কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তোলা, জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা ঘটনার সাথে নাম আসছে মন্ত্রী-এমপি’র পুত্রদের।

সম্প্রতি চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ আটক করেছে সাতক্ষীরার সংরক্ষিত মহিলা এমপি রিফাত আমিনের ছোট ছেলে রাশেদ সরোয়ার ওরফে রুমন। চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় গত ১৮.০৯.১৬ তারিখে তাকে আটক করে সাতক্ষীরা পুলিশ। চাঁদাবাজির দুটি অভিযোগে মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। রুমনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগটি দায়ের করেন তার মা যে দলের মনোনয়নে সংরক্ষিত কোটায় এমপি হয়েছেন সে দলেরই অঙ্গ সংগঠনের এক নেতা। দ্বিতীয় মামলাটিও চাঁদাবাজির, মামলাটি করেছেন সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। এবারই প্রথম নয় এর আগেও রুমন পুলিশের হাতে আটক হয়ে কারাগারে কয়েক দিনের জন্য অন্তরীণ ছিলেন। গত মে মাসে পুলিশ অস্ত্র ও তিন নারীসহ তাকে আটক করেছিল। পরে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি।

তবে শুধু রুমনই নয়, এরকম আরো অনেক এমপি আছেন যাদের পুত্র ধনরা নানা কীর্তি করে পত্রিকার হেড লাইন হয়ে মা-বাবার ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করেছেন। বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রীও অতীতে বহুবার ছেলের কুকীর্তির জন্য বার বার সংবাদ শিরোনাম হয়েছিলেন। তবে তাতে পদাবনতির পরিবর্তে তার পদোন্নতি হয়। আওয়ামী লীগের প্রথম সরকারে প্রতিমন্ত্রী থাকলেও এখন আরো একধাপ এগিয়ে তিনি ফুল মন্ত্রী হয়েছেন। এটাই যেন আমাদের দেশের স্বাভাবিক নিয়মে দাঁড়িয়েছে। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য লজ্জার। কারণ পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্তান অথবা আত্মীয়দের দুর্নীতির দায় মাথায় নিয়ে মন্ত্রিত্ব বা এমপি পদ থেকে পদত্যাগের নজির ভুরি ভুরি থাকলেও আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।

আইনগত ভাবে হয়তো সন্তানের কুকীর্তির দায় পিতা-মাতার ওপর বর্তায় না। তবে নৈতিক ও সামাজিক বিচারে সন্তানের কুকীর্তির দায় পিতা-মাতা এড়াতে পারেন না। সন্তানের সুকীর্তিতে পিতা-মাতা যদি গর্বিত হয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে চারদিকে তা জাহির করে অন্যদের জানান দিতে পারেন তবে তার কুকীর্তির দায় তারা নেবেন না কেন? তাছাড়া সন্তান নৈতিক মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষা তো পরিবার থেকেই পেয়ে থাকে। সন্তান সেই শিক্ষা না পেলে তা অবশ্যই পিতা-মাতার ব্যর্থতা বা দায়।

নৈতিক বোধসম্পন্ন সুশিক্ষিত সন্তান কখনোই রুমনদের মতো কুকীর্তি করে বাবা-মাকে ছোট করতে পারেন না। সন্তানদের সে শিক্ষা আমাদের এমপি মহোদয়রা কতটা দেন তার খোঁজ না জানলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধ সংগঠনে উৎসাহিত যে করেন তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কারণ অতীতে এরকম ঘটনার নজির রয়েছে। বিগত সরকারে রাজশাহী বিভাগের একজন প্রতিমন্ত্রীর ছেলে ও আত্মীয় স্বজনরা একবার তার নির্বাচনী এলাকায় টেন্ডারকে কেন্দ্র করে সরকারী কর্মকর্তাদের মারধোর করেন। এঘটনা সেসময় সব কটি পত্রিকায় গুরুত্বসহ ছাপা হয়। তবে সংবাদ পত্র গুরুত্ব দিলেও এ ঘটনাকে তেমন একটা পাত্তা দিলেন না প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই ভাগ্যের জোরে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া জেলা পর্যায়ের ওই নেতা। শাস্তি দেয়ার পরিবর্তে তিনি উল্টো অপরাধী স্বজনদের পক্ষে সাফাই গাইলেন। অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমার কিছু দুষ্ট আত্মীয়-স্বজনের কাজ এটি। অর্থাৎ দুষ্ট আত্মীয় স্বজনের কাজ বলে তিনি অপরাধের মাত্রাকে হাল্কা করে দিলেন, যেন এটি কোন ব্যাপারই না। ছোট ছোট ছেলেপেলেরা একটু দুষ্টুমি করেছে মাত্র, এটা আসলে আমলে নেয়ার কিছু না, যাহ, তোরা আর এসব করিস না। তার কথার মর্মার্থ যেন এমনটাই।

পরিবার কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় সন্তানরা পিতা-মাতা অথবা পরিবারের বড়দের কাছ থেকে আচার-আচরণ শিখে থাকে। এমনকি সন্তানরা ছোট বেলায় অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতার অনুকরণও করে থাকে, যা তাদের পরবর্তী জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই সন্তান যাতে পরিবার থেকে সুশিক্ষা পায় সেজন্য নিজেদের আচার-আচরণেও সতর্ক থাকতে হবে। কিন্তু আবারো দু:খের সাথে বলতে হচ্ছে নিজেদের আচরণের ক্ষেত্রেও আমাদের মাননীয় এমপি-মন্ত্রীদের কেউ কেউ (সবার কথা বলছি না) খুব বেশী সতর্ক বলে মনে হয় না। গত আগস্ট মাসের ২৯ তারিখে শোক দিবসের আলোচনার আয়োজন করে ঢাকা আইনজীবি সমিতি। আমি ওই অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহে গিয়েছিলাম। সেখানেই প্রত্যক্ষ করা একটি ঘটনা প্রাসঙ্গিক হওয়ায় এখানে উল্লেখ করছি। অনুষ্ঠানে যোগ দেন সরকারের মান্যবর দুই মন্ত্রী। মাগরিবের নামাজের ওয়াক্তে বিশেষ অতিথি মন্ত্রী বাহাদুর বার ভবনেরই সপ্তম তলায় গেলেন নামাজ পড়তে। নামাজের জন্য নির্ধারিত জায়গায় ঢোকার মুখে তিনি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন, এরপর ভৃত্য গোছের একজন এগিয়ে এসে মন্ত্রী বাহাদুরের পায়ের জুতা খুলে দিলেন। এমনকি নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত লোকটি জুতা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। নামাজ শেষে মন্ত্রী মহোদয় বের হয়ে আসলে ভৃত্য গোছের লোকটি আগের মতোই তার পদ যুগলে জুতা দু’খানি পরিয়ে দিলেন। এরপর মন্ত্রী বাহাদুর দিব্যি হেঁটে সপ্তম তলা থেকে অস্টম তলায় উঠে অনুষ্ঠানস্থলে গেলেন। তার কোন সমস্যা থাকলে তো পায়ে হেঁটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরের তলায় ওঠার কথা নয়। তাই সমস্যার কারণে অন্যকে দিয়ে তিনি নিজের পায়ে জুতা পরিয়ে নিয়েছেন, সে কথাটি সরলভাবে বলা কঠিন। মানবিক বোধের সঠিক জ্ঞানের কমতিতে আমাদের দেশের কোন কোন মন্ত্রী-এমপি (সবাই না) নিজেদের মুই কি হনুরে গোছের ভাবেন। তাদের কথা-বার্তা আচার-আচরণে তার বহি:প্রকাশ ঘটে অহরহ। হয়তো আমার দেখা মন্ত্রী বাহাদুরের কর্মটি সেই গোছেরই কিছু একটা হবে। তা নিজ ভৃত্যকে দিয়ে তিনি জুতা পরা বা খোলার কাজটি করতেই পারেন, তাতে অন্যের কিইবা যায় আসে। কিন্তু সমস্যা হলো এই কর্মটি যদি তিনি নিয়মিত করান এবং শুধু লোক সম্মুখেই নয়,বাড়ীতেও তা করান তবে তার সন্তানরা কি শিখবে? পিতার মতো তারাও তো ভৃত্য দিয়ে জুতা পরা এবং খোলার কাজটি শিখবে। জনসম্মুখে এমন কাজ করতে পিতা যেমন লজ্জিত হননি, সেও তেমনি বীরদর্পে পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে নি:সঙ্কোচে।

অথচ ছোট বেলায় পড়েছিলাম মুঘল বাদশাহ আলমগীর, ছেলে শিক্ষকের পায়ে শুধু পানি ঢেলেছে, হাত দিয়ে ধুয়ে দেয়নি কেন তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, ব্যথিত হয়েছিলেন। কবি কাদের নেওয়াজের কবিতায় ফুটে ওঠে সেই চিত্র- বাদশাহ কহেন, ‘সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে / নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন ? পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ওচরণ / নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে / ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে। একজন বাদশাহ যদি নিজ ছেলেকে দিয়ে গৃহশিক্ষকের পা ধুয়ে দিতে বলেন আর একজন মন্ত্রী বাহাদুর যদি ভৃত্যকে দিয়ে নিজের জুতা পরিয়ে নেন, তাহলে দুজনার কার ছেলে কি শিখবে, এর বিচার পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিলাম। সন্তানদের আদর্শ শিক্ষার মাধ্যমে যেমন বড় করতে হবে তেমনি আচরণ সংশোধন করে নিজে মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, তবেই সন্তানরাও আদর্শবাদী ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নির্লোভ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। সন্তান অপরাধ করলেও তার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তা না করে এমপি-মন্ত্রিত্বের উষ্ণ চাদরে অপরাধী সন্তানকে ঢেকে রাখলে সমাজে আইনের শাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে না, তেমনি ওই সন্তান ভবিষ্যতে দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে আরেকটি অপরাধ সংগঠণ করবে যা তার পিতা-মাতার ভাবমুর্তিকেই সঙ্কটে ফেলবে। রুমন মার্কা সন্তানের জন্য এমপি মায়েদেরও লজ্জিত হতে হবে বার বার।

ইমরুল কায়েস, সিনিয়র রিপোর্টার(কুটনৈতিক), বাংলাভিশন
kayeshdu@gmail.com

(দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত ০৪.১০.১৬)